লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো কোন পথে চলেছে
লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো কোন পথে চলেছে
Which Way Are Life Insurance Companies Going?
এখন ইচ্ছা করলেই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি করতে পারবে না এবং আমরা আশা করতে চাই সম্স্ত শংঙ্কা দুর করে বীমা খাত বাংলাদেশে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশে মুষ্টিমেয় কটি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন কারণে সমগ্র বীমা সেক্টরের উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো কোন ক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। পূর্ব থেকেই জানতাম যে, যে ব্যবসা সম্মানের যে ব্যবসায় মূলধন লাগে না সে ব্যাবসা হচ্ছে বীমা ব্যাবসা। কিন্তু বর্তমানে সাধারন মানুষ বীমার কথা শুনলে মানুষ নাক সিটকায়, কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্যি, এটা অত্যন্ত দুঃখ জনক ঘটনা। পৃথীবির উন্নত দেশে বীমা ছাড়া কোন কিছু কল্পনাই করা যায় না। ঐ উন্নত দেশে যারা বীমা নিয়ন্ত্রন করে তারা অত্যন্ত বীমার উপর অভিজ্ঞ এবং দক্ষ, তবে সেটা আমাদের দেশে অনুপস্থিত। বীমা খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারের ১১৮.৫০ কোটি টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ৫১৩.৫০ কোটি টাকাসহ মোট ৬৩২ কোটি টাকার অর্থায়নে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিআইএসডিপি) বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যা ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা। অথচ অনেকেই মনে করছেন যে, তারা দৃশ্যমান বীমা সংস্কারের তেমন কোন উন্নয়ন দেখছেন না। জনমনে প্রশ্ন ৬৩২ কোটি টাকার প্রকল্পের চলমান জীবন বীমা কর্পোরেশন, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অটোমেশনের জন্য বরাদ্ধকৃত অর্থের দৃশ্যমান উন্নয়ন কতদুর অগ্রগতি হয়েছে? সেটা অনেকেরই জানা নাই মর্মে অনেকেই মত প্রকাশ করছেন, তবে এ কথাও সত্যি যে, বীমা সেক্টরে বেশ কিছু উন্নয়নও দৃশ্যমান যেমন:
ইচ্ছা করলেই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি করতে পারবে নাঃ
বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরনের সার্থে বীমাকারী ও বীমা পলিসি গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ডিজিটাল সুবিধা প্রদান, বীমাকারী কর্তৃক বীমা পলিসি গ্রাহকগণকে প্রিমিয়াম রশিদ প্রেরণ (ডাক, কুরিয়ার ইত্যদি) বাবদ খরচ সাশ্রয়, এ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, সরকারি রাজস্ব ফাকি রোধ, বীমা পলিসি গ্রাহকগণের টাকা আত্নসাৎ বন্ধ, গ্রাহক হয়রানি রোধ এবং গ্রাহকগণের আস্থা বৃদ্ধিসহ সামগ্রিকভাবে বীমাখাতকে ডিজিটাইজেশনের লক্ষ্যে বীমা পৃতিষ্ঠানসমূহে Unified Messaging plat form (UMP) এর মাধ্যমে E-Receipt এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ ইচ্ছা করলেই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি করতে পারবে না।
ক) বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অটোমেশনের জন্য অনেক কাজ করা হয়েছেঃ জীবন বীমা কর্পোরেশন, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক সেক্টরে ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অটোমেশনের জন্য অনেক কাজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনাব মিরাজ, তবে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভবপর হয় নাই।
খ) কেন্দ্রীয় ডাটাবেস এবং কম্পিউটারাইজড সিস্টেমে কার্যক্রম পরিচালনা করাঃ প্রতিটি বীমা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে একটি কেন্দ্রীয় ডটিাবেস (Central Database) সহ Integrated Accounting Software, Policy Management Software ইত্যাদির সমন্বয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজড সিস্টেমে কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
গ) পেনিট্রেশন বৃদ্ধির প্রচেষ্টাঃ
Artificial Intelligence (AI) Blockchain ইত্যাদির সমন্বয়ে নির্ভুল ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বীমা খাতের পেনিট্রেশন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
লাইফ বীমা সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ
১) আইডিআরএ’র অনুসন্ধান এর কারণে ব্যপক দুর্নীতি ধরা পরছেঃ
বিভিন্ন লাইফ বীমা কোম্পানিতে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নিতি ধরা পড়ছে যেমনঃ (ক) ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকার তহবিল তসরুফ হয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফে। (খ) হোমল্যান্ড লাইফে অনিয়ম আত্মসাৎ ১০৪ কোটি টাকা ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যপক অনিয়ম এবং দুর্নীতি ধরা পরছে, তবে তাদের অনুসন্ধান চলমান আছে। (গ)‘অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়’এবং জমি ক্রয়ের নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দেশের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এবং পদস্থ কর্মকর্তারা নিজ মালিকানাধীন অন্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদানের মাধ্যমেও সরিয়ে নেয়া হচ্ছে অর্থ। গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ‘আইডিআরএ’র ভূমিকা বরাবরই সহযোগিতামূলক। বিরাট-বিপুল এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নেই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা।
২) দুদকের অনুসন্ধানিঃ দুদকের এক অনুসন্ধানেই বেরিয় আসে, ২০০৯-১৫ পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় খাতে ১ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা আইনি সীমার অতিরিক্ত খরচ করেছে। এর মধ্যে-পদ্মা ইসলামী লাইফ ১৬৬ কোটি ৮৩ লাখ, প্রগতি লাইফ ১৪৬ কোটি ৯৬ লাখ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ৮৬ কোটি ১৮ লাখ, মেঘনা লাইফ ৮৩ কোটি ৯৪ লাখ, ন্যাশনাল লাইফ ২১ কোটি ৩৭ লাখ, গোল্ডেন লাইফ ১৫৬ কোটি ২৫ লাখ, বায়রা লাইফ ৩৮ কোটি ৬৫ লাখ, সন্ধানী লাইফ ১৫৫ কোটি ৫৯ লাখ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ ৩৯ কোটি ৪৪ লাখ, পপুলার লাইফ ২৮৩ কোটি ৩৮ লাখ, সানলাইফ ৮৪ কোটি ১৩ লাখ, হোমল্যান্ড লাইফ ৪৬ কোটি ৯৫ লাখ, প্রাইম ইসলামী লাইফ ৭১ কোটি ৭৯ লাখ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ২০০ কোটি ৫১ লাখ, রূপালী লাইফ ৪৪ কোটি ৪০ লাখ এবং ডেল্টা লাইফ ৫৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা আইনি সীমার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে। কিন্তু দুদকের এখতিয়ার না থাকায় তখন অভিযোগগুলো যথাযথ ব্যবস্থা নিতে উল্টো অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইডিআরএ’র কাছেই ফেরত পাঠায়। সংস্থাটি ১৭টি বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে অন্তত: ২ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগটি ৬ বছর পর পুন:অনুসন্ধান করছে।
৩) পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও ৫৬০৯ গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না দেশের ৫ জীবন বীমা কোম্পানিঃ
পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও ৫৬০৯ গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না দেশের ৫ জীবন বীমা কোম্পানি। গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বায়রা লাইফ, সানলাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এ কাজ করছে। টাকার দাবিতে গ্রাহকরা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যেসব নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাছে পৌঁছাতে পারেনি, সে সংখ্যা হিসাব করলে তা ২০-২৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
৪) গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না, এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা বেশি নয়ঃ বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না, এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা বেশি নয়। তবে কয়েকটি কোম্পানি এ খাতের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি গ্রাহকদের টাকা দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে আইআরডিএকে। যদি কোনো কোম্পানির হাতে পরিশোধ করার টাকা না থাকে, তাহলে সম্পদ বিক্রি করেই সেটা দেওয়া উচিত।’ বাংলাদেশ বীমা একাডেমি এর প্রধান ফ্যাকাল্টি এসএম ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বড় ও সচ্ছল কোম্পানির বিরুদ্ধেও বীমা দাবির টাকা পরিশোধ করার মতো অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কী পরিমাণ গ্রাহক এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সে সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’
৫) বেশি অভিযোগ ছয় কোম্পানির বিরুদ্ধেঃ জীবনবীমা বকেয়া নিয়ে ৭০-৮০ শতাংশ অভিযোগই মূলত ছয়টি বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। এগুলো হল পদ্মা, সানফ্লাওয়ার, সানলাইফ, বায়রা, হোমল্যান্ড এবং গোল্ডেন লাইফ। এমন তথ্য জানিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইডিআরএর জীবনবীমা বিভাগের পরিচালক শাহ আলম বলেন, ‘আমরা পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের বিরুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার এবং হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায় ৬০০টি অভিযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে পদ্মার বিরুদ্ধে প্রায় আসা ৬ হাজার অভিযোগের নিষ্পত্তি করেছি। কিন্তু আমরা যে পরিমাণ অভিযোগ পেয়েছি, বাস্তব অবস্থা তার চেয়েও ভয়াবহ। কারণ প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এমন ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করতে জানে না।’
৬) জীবনবিমা পলিসির অর্ধেকই তামাদি হয়ে যায়ঃ বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, এক বছর পার করতে পারেনি, এমন পলিসি ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি পলিসির মেয়াদের মাত্র ৩০ শতাংশ, তিনটি কোম্পানি মেয়াদের ৪০ শতাংশ, চারটি কোম্পানি মেয়াদের ৫০ শতাংশের বেশি পার করতে পেরেছে। চারটি কোম্পানি পলিসি মেয়াদের ৬০ শতাংশের ওপরে এবং তিনটি কোম্পানি ৭০ শতাংশের বেশি পার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম বছরে প্রিমিয়াম আদায় হলেও ৭০ শতাংশই আদায় হয়নি পরের বছরে, এমন কোম্পানি রয়েছে তিনটি। প্রশ্ন হচ্ছে তামাদি পলিসির টাকা কোথায় যায়? গ্রাহকরা বলছেন, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন রকম প্রলোভন দেখিয়ে বিমার টাকা নেয়। কিন্তু পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর আর টাকা দেয় না। টাকার পেছনে ঘুরতে ঘুরতে পায়ের জুতার তলা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তাদের টালবাহানার শেষ হয় না।
৭) জীবন বিমা কোম্পানির পলিসি সংখ্যা কমে যাচ্ছেঃ বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য মতে, দেশের সরকারি-বেসরকারি জীবন বিমা কোম্পানির পলিসি সংখ্যা ৯০ লাখ ২ হাজার। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৫ হাজারটি। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ১৬ লাখ ৩ হাজারটি। শতাংশের হিসেবে কমেছে ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পলিসির সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭ লাখ ১ হাজারটি। ২০১৯ সালে বিমা কোম্পানিগুলোতে নতুন পলিসি কম হয়েছে। পাশাপাশি আগের বছরের চেয়ে বিমা দাবি পূরণ করেছে বেশি। এ কারণে পলিসির সংখ্যা ১৪ লাখ কম হয়েছে। ২০২০-২০২১ সালে পলিসির সংখ্যা অনেক কমেছে।
৮) বীমা কোম্পানির সম্পদঃ আইডিআরএর তথ্য বলছে, নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে বীমা পলিসি ২০২১ সালে ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৯০৭টিতে নেমে এসেছে। যা ২০২০ সালে ২৬ লাখ ১০৩টি, ২০১৯ সালে ৩১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩টি, ২০১৮ সালে ২৯ লাখ ৩৬ হাজার ৯৪৯টি এবং ২০১৭ সালে ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৬৩০টিতে নেমে এসেছে। ফলে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে গত পাঁচ বছরে পলিসি সংখ্যা কমেছে প্রায় ১২ লাখ ৭৮ হাজার ৭২৩টি। দেশে এখন বীমা খাতে মোট বিনিয়োগ ৪৫ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। অন্যদিকে দেশের বীমা খাতে মোট সম্পদ ২০২১ সালে ৬০ হাজার ৭২৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। যা গত ২০২০ সালে ছিল ৫২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। ২০২১সালে অনিরীক্ষিত হিসেবে জীবন বীমা কোম্পানির সম্পদ ৪৪ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমা কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ ১৫ হাজার৭৪৪ কোটি টাকা।
৯) লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে পলিসির সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং এগুলো এ্যলারমিং মনে হচ্ছেঃ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্র বলছে, লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে পলিসির সংখ্যা ২০০৯ সালে ছিল ১ কোটি ১ লাখ ৩ হাজার ৪০২। এরপরে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময়ে পলিসির সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ ছাড়ায়। ২০১৫ সালে ১ কোটি ১৫ লাখ ২২ হাজার ২০৯ এবং ২০১৬ সালে ১ কোটি ৫ লাখ ৬ হাজার ৫১ জনে নেমে আসে। এরপর ধারাবাহিকভাবেই কমেছে পলিসির সংখ্যা। ২০১৭ সালে ১ কোটি ৯ লাখ ৫১ হাজার, ২০১৮ সালে ১ কোটি ৬ লাখ, ২০১৯ সালে ৯৭ লাখ ৪১ হাজার, ২০২০ সালে অনিরীক্ষিত হিসেবে ৮৫ লাখ ৬৯ হাজার এবং ২০২১ সালে অনিরীক্ষিত হিসেবে ৮২ লাখ ৮০ হাজারে নেমে আসে। ফলে ২০১৭ সালের চেয়ে ২০২১ সালে লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতে পলিসি কমেছে প্রায় ২৬ লাখ ৭১ হাজার ৪১১টি। ননাবিধ বদনামের কারণে ২০২২ – ২০২৩ সালে সামনে পলিসির সংখ্যা আরও কমবে বলে অনেকেই মনে করছেন। এগুলো লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের জন্য এ্যলারমিং।
১০) অবৈধ ব্যয়ে খোদ জীবন বীমা কর্পোরেশনঃ ২০২১ সালে কোম্পানিটি ব্যবস্থাপনা ব্যয় খাতে খরচ করেছে ২৫৩ কোটি ৪৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা। তবে আইন অনুযায়ী বছরটিতে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ২০৬ কোটি ৯৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এ হিসাবে আইন লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটি ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৩১ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। আগের বছর ২০২০ সালে কোম্পানিটি ৪৩ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যয় করে। ২০২১ সালে কোম্পানিটি ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকার বিমা দাবি পরিশোধ করেনি। এর মধ্যে গ্রাহকের মৃত্যুজনিত বিমা দাবি রয়েছে ২৭ কোটি ২১ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ বিমা দাবি ২৪ কোটি ৩৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা, সার্ভাইবেল বেনিফিটি (এসবি) এক কোটি ৯১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং গ্রুপ বিমা দাবি পাঁচ কোটি ৯৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রয়েছে।
১১) ২ লাখ ৭১ হাজার ২৪০টি পলিসির দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছেঃ দৈনিক মানব জমিন ৮ আগস্ট ২০১৯ এর তথ্য অনুযায়ী আইডিআরএর সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে গত (২০২১) বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য রয়েছে। তাতে দেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর অনিষ্পন্ন দাবিতে ৫৭২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আটকে আছে। ২ লাখ ৭১ হাজার ২৪০টি পলিসির দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু দাবি, মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি, সারেন্ডার বা মেয়াদ পুর্তির আগে বীমা ভেঙে ফেলা, সার্ভাইবেল বেনিফিট এবং গোষ্ঠী ও স্বাস্থ্য বীমার দাবি রয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বর শেষে ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৩টি পলিসি তামাদি অবস্থায় রয়েছে। কোনো পলিসি কিছুদিন নিয়মিত চলার পর গ্রাহক আর পরিচালনা না করলে সেগুলো তামাদি হয়ে যায়। এসব পলিসির গ্রাহকদের মধ্যে যাদের নিয়ম অনুযায়ী অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা, তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না।
তবে কিছু জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ভালো সংবাদও আছেঃ
ক) বীমা দাবির পরিমাণ উত্থাপনের প্রায় ২০০৯-১৬ পর্যন্ত ৮০ শতাংশ পরিশোধঃ জাগো নিউজ তারিখ ০৭ জানুয়ারি ২০১৮ এর তথ্য অনুযায়ী সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানিগুলো বিগত আট বছরে গ্রাহকদের ২০ হাজার কোটি টাকার ওপরে দাবি পরিশোধ করেছে। পরিশোধ করা এ বীমা দাবির পরিমাণ উত্থাপনের প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১৬ পর্যন্ত মোট ২৪ হাজার ৯৮১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বীমা দাবি উত্থাপন করেন গ্রাহকরা। এর মধ্যে বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের পরিশোধ করে ২০ হাজার ১৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ উত্থাপিত দাবির ৮০ শতাংশই বীমা কোম্পানিগুলো পরিশোধ করেছে। অন্যভাবে বলা যায় ১০০ টাকার দাবি উত্থাপিত হলে কোম্পানিগুলো গড়ে ৮০ টাকা পরিশোধ করেছে। বীমা দাবি উত্থাপন ও পরিশোধ-সংক্রান্ত বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
খ) ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ৪১৩ কোটি টাকার বীমা দাবি পরিশোধঃ দৈনিক বনিক বার্তার মার্চ ০৬, ২০২২ তথ্য অনুযায়ী ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদ বীমা গ্রাহকের দাবি পরিশোধের জন্য কোম্পানির অনুকূলে ৪১৩ কোটি টাকার তহবিল অনুমোদন দেয়া হয়।
গ) পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ৭ হাজার ৪৬৮ জন বীমা গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ করেছেঃ
আগস্ট ০৫, ২০২২ তারিখের দৈনিক বনিক বার্তার তথ্য অনুযায়ী পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ৭ হাজার ৪৬৮ জন বীমা গ্রাহকের বীমা দাবির মোট ২৪ কোটি ৪১লাখ ৬৮ হাজার ১৮৯ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদজয়নুল বারী।
IDRA এর চেয়াম্যান জনাব মোহাম্ম জয়নুল বারী বলেন “বীমা বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত থাকা সত্ত্বেও অনেক পিছিয়ে আছে। এ জন্য সরকার বীমা খাতের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে“। অন্য সকল খাত যেভাবে জিডিপিতে অবদান রাখছে বীমা খাত সেভাবে পারছেনা। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় তাদের বীমার পেনিট্রেশন কত বেশি। তাইওয়ানের ২০.১ শতাংশ, দক্ষিণ অফ্রিকার ১৪.৭০ শতাংশ ও ভারতের ৪ শতাংশ। আর আমাদের পেনিট্রেশন ০.৪ শতাংশ। তবে আমরা বলে থাকি ০.৫ শতাংশ। কিন্তু এটা অনেক কম বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। তবে এ জন্য অনেক কারণও আছে যেমন: মটর বীমা না করার বাধ্যবধকতা, বীমা ষ্ট্যম্পের হার নির্ধারন, অনৈতিক কমিশন ব্যবস্থা, টেরিফ রেট কমানো, কতিপয় লাইফ বীমা খাতে চরম অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। বীমা খাতের বিকাশের জন্য প্রয়োজন বাস্তবমূখী আইনী কাঠামো এবং বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, সেবা সহজিকরণ, বীমা দাবি দ্রুত নিশ্পত্তিকরণ, সুশৃংঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় বীমা সেবা পৌছায়ে দেয়া। আমরা আশা করতে চাই সমস্ত শংঙ্কা দুর করে বীমা খাত বাংলাদেশে এগিয়ে যাবে।

No comments